বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি
আপনি কি বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চান? তাহলে আজকের
আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিড়ালের কামড়ে
জলাতঙ্কের ঝুঁকি, জলাতঙ্ক কি এবং কেন এটি ভয়ংকর, বিড়াল ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের
সম্পর্ক, কিভাবে বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়
বিড়ালের কামরের পর প্রাথমিক উপসর্গ কি হতে পারে, জলাতঙ্কের পরবর্তী লক্ষণ, কোন ধরনের বিড়ালের কামড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, বিড়ালের কামড়ের পর প্রাথমিক চিকিৎসা কি, টিকাদান ও বিড়ালের স্বাস্থ্য, গ্রাম ও শহরে জলাতঙ্কের ঝুঁকির পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। তাহলে চলুন দেরি না করে আমরা আর্টিকেলে ফিরে যাই।
পেজ সূচিপত্রঃ বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি
- বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি
- জলাতঙ্ক কি এবং কেন এটি ভয়ংকর
- বিড়াল ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের সম্পর্ক
- কিভাবে বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়
- বিড়ালের কামড়ের পর প্রাথমিক উপসর্গ কি
- জলাতঙ্কের পরবর্তী লক্ষণ সমূহ
- কোন ধরনের বিড়ালের কামড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ
- বিড়ালের কামরের পর প্রাথমিক চিকিৎসা
- টিকাদান ও বিড়ালের স্বাস্থ্য
- গ্রাম ও শহরে জলাতঙ্কের ঝুঁকির পার্থক্য
- লেখকের মন্তব্য
বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি
বিড়াল আমাদের অনেকের প্রিয় পোষা প্রাণী। ঘরে বা আশে পাশে থাকা বিড়াল
সাধারণত নিরীহ হলেও কখনো কখনো তারা কামর বা আঁচড় দিতে পারে। অনেকেই ভাবেন
বিড়ালের কামড় খুব একটা বিপদজনক নয়। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে জলাতঙ্ক নামের
মারাত্মক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই বিড়ালের কামড়কে কখনোই হালকা ভাবে
নেওয়া উচিত নয়। জলাতঙ্ক একটি ভাইরাস জনিত রোগ যা সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর
লালা থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
যদি কোন বিড়াল জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয় এবং সে কাউকে কামড় দেয় তাহলে সেই
ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে রাস্তার বা বেওয়ারিশ
বিড়ালের কামড়ে এই ঝুঁকি তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকে। কারণ তাদের স্বাস্থ্য
পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানা যায় না। বিড়ালের কামড় এর মাধ্যমে
জলাতঙ্ক ছড়ানোর প্রধান কারণ হলো আক্রান্ত প্রাণীর লালা। কামড় দেওয়ার সময়
সেই লালা ক্ষতের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে যায়। অনেক সময় খুব ছোট ক্ষত বা আচরের
মাধ্যমেও ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তাই সামান্য আঁচড় বা কামড় হলেও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া
জরুরী। বিড়ালের কামড় খাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার
করা। কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ক্ষত ধুয়ে
ফেলতে হবে। এতে ভাইরাসের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। এরপর যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ
স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। যাতে প্রয়োজন হলে জলাতঙ্কের
টিকা নেওয়া যায়। অনেকেই ভুল করে ভাবেন যদি বিড়ালটি পোষা হয় তাহলে কোন
সমস্যা নেই কিন্তু আসলে পোষা বিড়ালও যদি নিয়মিত টিকা না পায় বা বাইরে
ঘোরাফেরা করে তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই পোষা প্রাণীকেও নিয়মিত ভ্যাকসিন দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুধু প্রাণী
নিরাপদ থাকে না পরিবারের সদস্যরা সুরক্ষিত থাকে। জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মারাত্মক
রোগ কারণ একবার লক্ষণ দেখা দিলে এটি প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হতে পারে।
তাই প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে বড় উপায়। বিড়াল বা অন্য কোন প্রাণীর কামরকে
অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া এবং প্রয়োজনীয় টীকা গ্রহণ করা জীবন
রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিড়ালের কামড় ছোট মনে হলেও এর পেছনে বড়
ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। তাই সচেতন থাকা, ক্ষত দ্রুত পরিষ্কার করা এবং সময়মতো
চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
জলাতঙ্ক কি এবং কেন এটি ভয়ংকর
জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়
বা আঁচরের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। সাধারণত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল আর
কিছু বন্যপ্রাণীর শরীরে এই ভাইরাস থাকতে পারে। যখন কোন আক্রান্ত প্রাণী মানুষকে
কামড়ায় তখন তার লালার মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে
স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করতে শুরু করে। জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে
প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটায়। তাই এটি পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর সংক্রামক
রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জলাতঙ্ক রোগের সবচেয়ে বড় ভয়ংকর দিক হলো এটি শুরুতে সহজে বোঝা যায় না। কামর
বা আঁচর লাগার পর অনেক সময় কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা
নাও যেতে পারে। কিন্তু ভাইরাসটি শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে স্নায়ুর মাধ্যমে
মস্তিষ্কের দিকে অগ্রসর হয়। যখন লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে তখন রোগীর মধ্যে
জ্বর, মাথাব্যথা, অস্থিরতা, পানি দেখলে ভয় পাওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং
খিচুনির মতো উপসর্গ দেখা যায়। এই পর্যায়ে পৌঁছে গেলে রোগটি প্রায়
অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়।
জলাতঙ্ক এত ভয়ঙ্কর হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এর মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্য অনুযায়ী লক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই রোগ থেকে বেঁচে
যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই প্রতিরোধই হলো এর প্রধান উপায়। যদি কোন প্রাণী
কামড়ায় বা আঁচড় দেয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান সাবান ও পরিষ্কার পানিতে
অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকা নিতে হবে। সময় মত টিকা নিলে এই মারাত্মক রোগ থেকে
বাঁচা সম্ভব। বাংলাদেশ সহ অনেক দেশে এখনো জলাতঙ্ক একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা
হিসেবে রয়েছে। বিশেষ করে পথকুকুরের কামড় থেকে অনেক মানুষ ঝুঁকিতে পড়ে। তাই
সচেতনতা বৃদ্ধি, পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দেওয়া এবং কামরের পর দ্রুত
চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিড়াল ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের সম্পর্ক
বিড়াল ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের সম্পর্ক নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। জলাতঙ্ক একটি
মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের
মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। যদিও কুকুরকে জলাতঙ্কের প্রধান বাহক হিসেবে ধরা
হয়, তবুও বিড়াল এই ভাইরাস বহন করতে পারে। কোন বিড়াল যদি জলাতঙ্কে আক্রান্ত
কোনো প্রাণীর সংস্পর্শে আসে বা তার কামড় খায় তাহলে সেই বিড়ালের শরীরে
ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে এবং পরবর্তীতে মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত বিড়ালের আচরণ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে না।
অনেক সময় তারা অস্বাভাবিকভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে যায়, বেশি লালা ঝরতে থাকে এবং
খাবার খেতে সমস্যা দেখা দেয়। আবার কখনো বিড়ালটি হঠাৎ খুব দুর্বল হয়ে পড়ে বা
অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে যায়। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে বিড়ালটির কাছাকাছি
যাওয়া বা স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ আক্রান্ত বিড়ালের লালার
মাধ্যমে জলাতঙ্ক ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যদি কোন বিড়াল
মানুষকে কামড়ায় বা আচর দেয় তাহলে বিষয়টিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত
নয়। প্রথমে ক্ষতস্থান সাবান ও পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং
যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রয়োজনে জলাতঙ্ক প্রতিরোধের টিকা নিতে হবে। সময় মতো টিকা নিলে এ মারাত্মক
রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।
কিভাবে বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়
বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ানোর বিষয়টি অনেকেই গুরুত্ব সহকারে ভাবেনা। কিন্তু
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি। জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক ভাইরাস জনিত
রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে ছড়ায়। যদি কোন বিড়াল জলাতঙ্ক
ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং সেই বিড়াল মানুষকে কামড়ায় তাহলে তার লালার সাথে
থাকা ভাইরাস ক্ষতস্থানের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে রায়।। এই ভাইরাস
ধীরে ধীরে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত বিড়ালের কামড় সাধারণত গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। কারণ
বিড়ালের দাঁত ধারালো ও সূচালো হয়।
কামরের ফলে ত্বক ফেটে গেলে ভাইরাস সহজে শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। শুধু কামড়ি নয়
অনেক সময় বিড়ালের আঁচড় বা খোলা ক্ষতে আক্রান্ত বিড়ালের লালা
লাগলেও জলাতঙ্ক ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। তাই কোন বিড়াল কামড়ালে বা আঁচর দিলে
বিষয়টিকে কখনোই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক
সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরী। প্রথমে
ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার সাবান ও প্রবাহিত পানিতে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলতে
হবে। এরপর যতদ্রুত সম্ভব নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ
নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন,
যা সময় মতো নিলে এ মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচা যায়।
বিড়ালের কামড়ের পর প্রাথমিক উপসর্গ কি
বিড়ালের কামড়ের পর প্রথম যে উপসর্গ গুলো দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে
ক্ষতস্থানে ব্যথা, লালচে ভাব এবং ফুলে যাওয়া। অনেক সময় কামড়ের জায়গা
গরম হয়ে যেতে পারে এবং সেখানে পুঁজ জমার সম্ভাবনা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে হালকা
জ্বর, মাথা ব্যথা বা শরীর দুর্বল লাগার মত উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদি সংক্রমণ
বেড়ে যায় তাহলে ক্ষতস্থানের আশেপাশে তীব্র ব্যথা, ফুলে যাওয়া অতিরিক্ত ভাবে
বৃদ্ধি পাওয়া এবং লাল দাগ ছড়িয়ে পড়ার মত লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
যদি বিড়ালটির জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে কিছু সময় পরে আরো গুরুতর
লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন অস্থিরতা, জ্বর, গলা শক্ত হয়ে যাওয়া, পানি দেখলে
ভয় পাওয়া বা খিচুনি হওয়া। যদিও লক্ষণ গুলো সাধারণত অনেক পরে প্রকাশ পায়
তবুও শুরু থেকে সতর্ক থাকা জরুরী। কারণ জলাতঙ্কের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে
রোগটি অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে উঠে।
জলাতঙ্কের পরবর্তী লক্ষণ সমূহ
জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণ পার হওয়ার পর রোগীর শরীরে বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যা
দেখা দিতে শুরু করে। আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক অস্থিরতা, উদ্বেগ এবং আচরণগত
পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারে। অনেক সময় রোগী অকারণে ভয় পায় বা অস্বাভাবিক
রাগ প্রকাশ করে। এছাড়াও মাথা ব্যথা ও জ্বর এবং শরীরে দুর্বলতা ধীরে ধীরে
বাড়তে থাকে। এসব লক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে ভাইরাসটি ইতিমধ্যে স্নায়ুতন্ত্রে
আক্রমণ করেছে। জলাতঙ্কের অন্যতম পরিচিত এবং ভয়ঙ্কর লক্ষণ হলো পানির প্রতি ভয়
বা হাইড্রোফোবিয়া। রোগী পানি দেখলেই বা পানি পান করতে গেলেই গলায় তীব্র
খিঁচুনি অনুভব করে, ফলে পানি পান করতে ভয় পায়।
একই সঙ্গে অনেক সময় বাতাসের প্রবাহেও অস্বস্তি বা খিঁচুনি দেখা যায় যাকে
অ্যারোফোবিয়া বলা হয়। রোগীর গলা শুকিয়ে যায় কিন্তু তবুও পানি পান করতে পারে
না। এই সময় অতিরিক্ত লালা পড়া, গিলতে অসুবিধা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।
রোগটি আরো অগ্রসর হলে রোগীর মধ্যে খিচুনি, বিভ্রান্তি এবং অসচেতনতার মত গুরুতর
সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হ্যালুসিনেশন বা অদ্ভুত কিছু দেখার
বা শোনার অভিজ্ঞতা পেতে পারে। ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অবশ
হয়ে যেতে শুরু করে এবং রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। এই পর্যায়ে
চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
কোন ধরনের বিড়ালের কামড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ
বিড়াল অনেকেরই প্রিয় পোষা প্রাণী। তবে বিড়ালের কামড় কখনো কখনো মানুষের জন্য
মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের বিড়ালের কামড় সংক্রমণ
ও রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে বেশি বিপদজনক। প্রথমত রাস্তার বা বন্য পরিবেশে
থাকা বিড়ালের কামড় সবচেয়ে বেশি ঝুকিপূর্ণ বলে ধরা হয়। এ ধরনের বিড়াল
সাধারণত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত থাকতে পারে এবং তাদের শরীরে নানা ধরনের
ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থাকতে পারে। বিশেষ করে জলাতঙ্কের মত মারাত্মক রোগের
ঝুঁকি এসব বিড়ালের ক্ষেত্রে বেশি থাকে। রাস্তার বিড়াল মানুষের সংস্পর্শে কম
আসে এবং চিকিৎসা বা টিকা পায়না। তাই তাদের কামড়ে সংক্রমনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে
দেয়।
দ্বিতীয়ত, অসুস্থ বা অস্বাভাবিক আচরণ করা বিড়ালের কামড়ও অত্যন্ত বিপদজনক হতে
পারে। যদি কোন বিড়াল হঠাৎ আক্রমনাত্মক হয়ে যায়, অতিরিক্ত লালা ঝরায় বা
অস্বাভাবিক আচরণ করে তাহলে সেটি কোন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের বিড়ালের
কামড় থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তৃতীয়ত, টিকা না দেওয়া পোষা বিড়ালের কামড়ও
ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেক সময় মানুষ মনে করে পোষা বিড়ালের কামড়ে কোন সমস্যা
হয় না। কিন্তু যদি সে বিড়াল নিয়মিত টিকা না পায় তাহলে সংক্রমণের সম্ভাবনা
থাকে। বিড়ালের মুখে অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা কামড়ের মাধ্যমে মানুষের
শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ফলে ক্ষতস্থানে ফোলা, ব্যথা বা জ্বরের
মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিড়ালের কামরের পর প্রাথমিক চিকিৎসা
বিড়াল আমাদের অনেকেরই শখের পোষা প্রাণী হলেও এই বিড়ালের কামড় অনেক সময়
মানুষের জন্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিড়ালের দাঁত খুব ধারালো হওয়ায় কামড়
সাধারণত ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের সম্ভাবনা
থাকে। তাই বিড়ালের কামড়ের পর দ্রুত ও সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়াটা খুব
জরুরি। প্রথম ধাপে বিড়ালের কামড়ের ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করা
জরুরি। কামড় লাগার সাথে সাথে ক্ষতস্থানে পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে
কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে ধুয়ে নিতে হবে। এতে ক্ষতের ভেতরে থাকা ময়লা,
জীবনু ও ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই
ধাপটি সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিষ্কার করার
সময় ক্ষতস্থান বেশি ঘষাঘষি করা উচিত নয়।
ক্ষত পরিষ্কার করার পর সেখানে জীবনুনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন
অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড বা দ্রবণ ক্ষতস্থানে লাগালে জীবাণুর বিস্তার কমে। এরপর
প্রয়োজনে পরিস্কার গজ বা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে যাতে বাইরের ধুলাবালি
বা ময়লা সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তবে ক্ষত যদি খুব গভীর হয় বা বেশি
রক্তপাত হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। বিড়ালের কামড়ের
ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলাতঙ্কের ঝুঁকি। যদি কামড় দেওয়া
বিড়ালটি অজানা, রাস্তার বা অসুস্থ মনে হয় তাহলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য
কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। অনেক সময় চিকিৎসক
প্রয়োজন অনুযায়ী জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকা বা অন্যান্য চিকিৎসা দিতে পারে।
এতে ভবিষ্যতে গুরুত্বর জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
টিকা দান ও বিড়ালের স্বাস্থ্য
বিড়ালের জন্য বিভিন্ন ধরনের টিকা রয়েছে, যা তাকে মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষা
দেয়। বিশেষ করে জলাতঙ্ক, ফ্লু এবং অন্যান্য ভাইরাস জনিত রোগ প্রতিরোধের টিকা
অত্যন্ত কার্যকর। একটি বিড়াল যদি নিয়মিত টিকা পায়, তাহলে তার শরীরের রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সে সহজে কোন রোগে আক্রান্ত হয় না। পোষা
বিড়ালের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী টিকা দেওয়া উচিত যা সাধারণত পশু
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বিড়ালের সামগ্রিক
স্বাস্থ্য পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিষ্কার পরিবেশে রাখা, পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
করানো তার সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। অনেক সময় বিড়াল অসুস্থ হলেও তা সহজে বোঝা
যায় না। তাই নিয়মিত পশু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করানো হলে সম্ভবত
শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া যায়। বিড়ালের স্বাস্থ্য ভালো
রাখতে টিকাদান একটি অপরিহার্য বিষয়। তাই নিয়মিত টিকা দিলে, পরিষ্কার পরিবেশে
রাখলে এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করলে বিড়াল সুস্থ ও সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে
মানুষের মধ্যেও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়।
গ্রাম ও শহরে জলাতঙ্কের ঝুঁকির পার্থক্য
জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাস জনিত রোগ, যা সাধারণত কুকুর, বিড়াল বা
অন্যান্য প্রাণীর কামরের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই রোগের লক্ষণ
একবার প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। গ্রাম ও শহরের
পরিবেশ, স্বাস্থ্য সেবা এবং মানুষের সচেতনতার পার্থক্যের কারণে জ্বলাতকের
ঝুঁকিও অনেক সময় ভিন্ন হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত জলাতঙ্কের ঝুঁকি
তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো সেখানে অনেক সময় অবাধে ঘুরে
বেড়ানো কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা বেশি থাকে।
এসব প্রাণীর অনেকেই টিকা পায়না এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় না। ফলে যদি
কোন প্রাণী আক্রান্ত হয়, তাহলে তা সহজেই অন্য প্রাণী বা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে
পড়তে পারে। এছাড়া গ্রাম অঞ্চলে অনেক মানুষ এখনও প্রাণীর কামড়ে গুরুত্ব দিয়ে
দ্রুত চিকিৎসা নেয় না, যা ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে
পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। শহরে সাধারণত পশু চিকিৎসা ব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি
এবং স্বাস্থ্যসেবা তুলনামূলকভাবে উন্নত থাকে। অনেক পোষা প্রাণী নিয়মিত টিকা
পায় এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে শহরের মানুষ সচেতন হওয়ার কারণে প্রানির কামড়ের পর দ্রুত হাসপাতালে
যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে জলাতঙ্ক ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে
রাখা সম্ভব হয়। তবে শহরেও ঝুঁকি পুরোপুরি নেই এমন নয়। অনেক শহরেও রাস্তার
কুকুর বা বিড়ালের সংখ্যা কম নয়। যদি এসব প্রাণির টিকাদান ও নিয়ন্ত্রণ ঠিকমতো
না করা হয়, তাহলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে
এই ঝুঁকি বেশি। কারণ তারা অনেক সময় প্রাণির কাছে চলে যায় বা তাদের সাথে খেলতে
গিয়ে কামড় খেতে পারে। তাই বলা যায়, গ্রাম্য ও শহর উভয় জায়গাতেই জলাতঙ্ক
একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা।
লেখকের মন্তব্যঃ বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি
প্রিয় পাঠক, বিড়ালের কামড়ের কারণে জলাতঙ্কের ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা উপরে
বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এই আর্টিকেলে আমরা বিড়ালের কামরে জলাতঙ্কের ঝুঁকি,
জলাতঙ্ক কি এবং কেন এটি ভয়ংকর, বিড়াল ও জলাতঙ্ক ভাইরাসের সম্পর্ক, কিভাবে
বিড়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়, বিড়ালের কামড়ের পর প্রাথমিক উপসর্গ,
জলাতঙ্কের লক্ষণ, কোন ধরনের বিড়ালের কামড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, বিড়ালের কামড়ের
পর প্রাথমিক চিকিৎসা, টিকাদান ও বিড়ালের স্বাস্থ্য, গ্রাম ও শহরের জলাতঙ্কের
ঝুঁকির পার্থক্য এসব নিয়ে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি।
সবশেষে বলা যায়, জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত মারাত্মক রোগ। এ রোগের লক্ষণ একবার
প্রকাশ পেলে তা শতভাগ মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে এটাও বলা যায় যে, জলাতঙ্ক
একটি মারাত্মক কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। গ্রাম ও শহরে ঝুঁকির মাত্রা কিছুটা
ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরী। প্রাণীর কামড়কে কখনোই অবহেলা
করা উচিত নয়।



রাইসা ওয়ার্ল্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url